মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্নভঙ্গ ও দুর্ভোগের মূল কারণ

বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য স্বপ্নের পথে ঋণ, ঝুঁকি ও প্রতারণা — জানুন আগে

প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনে কাজ করতে যান। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির বড় ভরসা। কিন্তু যাওয়ার আগেই অনেককে এমন খরচ ও ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়, যা পরিবারকে বছরের পর বছর ঋণে ফেলে দেয়।

এক নজরে
  • সরকার-নির্ধারিত খরচের চেয়ে শ্রমিকদের বাস্তবে কয়েক গুণ বেশি টাকা দিতে হয়, এমন প্রতিবেদন বারবার এসেছে।
  • অনেকে জমি বিক্রি বা ঋণ করে টাকা জোগাড় করেন; ঋণ শোধ করতে দুই-তিন বছর লেগে যেতে পারে।
  • দালাল, "ফ্রি ভিসা" ও ভুল প্রতিশ্রুতি থেকে সাবধান থাকাই প্রথম সুরক্ষা।

১. যেতে কত টাকা লাগে?

সরকার প্রতিটি দেশের জন্য সর্বোচ্চ অভিবাসন খরচ ঠিক করে দেয়। কিন্তু প্রতিবেদন অনুযায়ী বাস্তবে শ্রমিকরা অনেক বেশি দেন। নিচের তালিকার সরকারি অঙ্কগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্ধারিত হারের, যা পরিবর্তন হতে পারে। যাওয়ার আগে অবশ্যই বিএমইটির ওয়েবসাইটে সর্বশেষ হার যাচাই করুন।

দেশসরকার-নির্ধারিত (টাকা)বাস্তবে যা প্রতিবেদনে এসেছে
সৌদি আরব১,৬৫,০০০বিবিএস-আইএলও জরিপে গড়ে ৪,৩৬,৩৬৬; কোনো প্রতিবেদনে ৫–৬ লাখ বা তারও বেশি
কুয়েত১,০৬,৭৮০"ফ্রি ভিসা"য় ৭,৩৩,৩০৩ এবং সাধারণ ওয়ার্ক ভিসায় ৬,১৯,১৬৭ (জরিপ অনুযায়ী)
সংযুক্ত আরব আমিরাত১,০৭,৭৮০সরকারি হারের কয়েক গুণ পর্যন্ত
ওমান১,০০,৭৮০সরকারি হারের কয়েক গুণ পর্যন্ত
বাহরাইন৯৭,৭৮০সরকারি হারের কয়েক গুণ পর্যন্ত
সৌদি আরব: সরকারি বনাম বাস্তব খরচ (টাকা) সরকারি ১,৬৫,০০০ বাস্তব গড় ৪,৩৬,৩৬৬ সূত্র: বিবিএস-আইএলও জরিপ (২০২০) এবং গণমাধ্যম প্রতিবেদন
সৌদি আরবে সরকারি হারের প্রায় আড়াই গুণ বেশি খরচের গড় চিত্র।

এই বাড়তি টাকা যায় কোথায়? প্রতিবেদনে বারবার এসেছে ভিসা বেচাকেনা, মধ্যস্থ দালাল ও এজেন্সির অতিরিক্ত আদায়ের কথা। অথচ আইএলও-র নীতি অনুযায়ী নিয়োগের খরচ শ্রমিকের নয়, নিয়োগকর্তার বহন করার কথা।

প্রবাসগামী শ্রমিকরা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন
ছবি: প্রবাসগামী শ্রমিকরা। (এখানে নিজের ছবি বসান এবং ক্যাপশন বদলে নিন)

২. কী কী সমস্যার মুখে পড়েন শ্রমিকরা?

ঋণের বোঝা

জমি বিক্রি বা উচ্চ সুদে ঋণ করে টাকা জোগাড় করতে হয়। বিদেশে গিয়ে আয় কম হলে ঋণ শোধ করতে বছরের পর বছর লাগে।

ভিসা বাণিজ্য ও "ফ্রি ভিসা"

ভিসা কিনে বেশি দামে বিক্রি হয়। অনেক সময় কাজের নিশ্চয়তা ছাড়াই বিপুল টাকা দিয়ে যেতে হয়।

প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবের গরমিল

দেশে বলা বেতন, কাজের ধরন বা থাকার ব্যবস্থার সঙ্গে গিয়ে যা পান তা মেলে না, এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়।

কম দক্ষতা, কম মজুরি

প্রশিক্ষণ ছাড়া গেলে কম বেতনের কাজেই আটকে থাকতে হয়। এতে ঋণ শোধ আরও কঠিন হয়।

দেশে টাকা পাঠানোর ঝামেলা

কম আয়ের শ্রমিকদের ছোট অঙ্কের টাকা পাঠানো কঠিন হতে পারে, ফলে অনেকে অনানুষ্ঠানিক পথে যান।

নিরাপত্তা ও অধিকার

কাজের পরিবেশ, বেতন পাওয়া ও কাগজপত্র নিয়ে সমস্যায় পড়লে কোথায় অভিযোগ করবেন তা জানা না থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।

৩. যাওয়ার আগে ৭টি জরুরি কাজ

  • এজেন্সির বৈধ লাইসেন্স (আরএল নম্বর) বিএমইটির তালিকায় মিলিয়ে নিন।
  • কোনো টাকা দেওয়ার আগে লিখিত চুক্তি ও বেতনের শর্ত দেখে নিন।
  • প্রতিটি টাকার রসিদ নিন এবং সব কাগজের ফটোকপি রাখুন।
  • শুধু মুখের কথায় বা পরিচিত দালালের ভরসায় ভিসা কিনবেন না।
  • সম্ভব হলে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট কাজের ওপর প্রশিক্ষণ নিন।
  • সরকারি হারের চেয়ে বেশি টাকা চাইলে প্রমাণসহ অভিযোগ করুন।
  • পরিবারকে গন্তব্য দেশের ঠিকানা, নিয়োগকর্তার তথ্য ও দূতাবাসের যোগাযোগ দিয়ে রাখুন।

৪. যাত্রার প্রস্তুতিতে যা কাজে লাগতে পারে

এই অংশে অ্যাফিলিয়েট লিংক আছে। এসব লিংকে কিনলে আমরা সামান্য কমিশন পেতে পারি, আপনার খরচ বাড়ে না। কিছু কেনা জরুরি নয়; আগে কাগজপত্র ও চুক্তির দিকে মনোযোগ দিন।

ডকুমেন্ট অর্গানাইজার

পাসপোর্ট, ভিসা ও চুক্তির কাগজ এক জায়গায় গুছিয়ে রাখতে।

অ্যামাজনে দেখুন

লাগেজ ওয়েট স্কেল

ওজনসীমা পার হয়ে বিমানবন্দরে বাড়তি টাকা গুনতে হওয়া এড়াতে।

অ্যামাজনে দেখুন

পাওয়ার ব্যাংক

ভ্রমণ ও প্রথম দিনগুলোতে ফোন চালু রাখতে।

অ্যামাজনে দেখুন

ট্রাভেল অ্যাডাপ্টর

গন্তব্য দেশের প্লাগ টাইপ মিলিয়ে কিনুন।

অ্যামাজনে দেখুন
কাগজপত্র যাচাই করছেন একজন প্রবাসগামী ব্যক্তি
ছবি: যাওয়ার আগে কাগজপত্র যাচাই করুন। (এখানে নিজের ছবি বসান)

শেষ কথা

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া অনেক পরিবারের জন্য উন্নত জীবনের পথ হতে পারে। কিন্তু সেই পথে ঠিকমতো খোঁজখবর না নিলে সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকিও থাকে। তাই তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি ধাপ যাচাই করুন। আপনার চেনা কেউ প্রবাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে এই লেখাটি তাকে পাঠান, হয়তো একটি পরিবার বড় ক্ষতি থেকে বাঁচবে।

সতর্কতা: এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। সরকারি ফি, নিয়ম ও গন্তব্য দেশের শর্ত সময়ে সময়ে বদলায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিএমইটি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করুন।

তথ্যসূত্র

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।

আপনার মন্তব্য লিখুন